নগ্নতা কখনোই কোনো নারীর অধিকার হতে পারে না। একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী নিজের ইচ্ছায় কী পরবেন বা কীভাবে নিজেকে উপস্থাপন করবেন – সেটি অবশ্যই তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে যখন পরিকল্পিতভাবে ‘নারীর অধিকার’, ‘মুক্তি’, ‘স্বাধীনতা’ কিংবা ‘সেলিব্রিটি সংস্কৃতি’র নামে কখনও নগ্ন বা কখনও অর্ধনগ্ন করে প্রচার ও বাজারজাত করা হয়, তখন প্রশ্ন উঠবেই – এই প্রচারের উদ্দেশ্য কি এবং সুবিধাভোগী কারা? বিষয়টি নিয়ে লিখেছেন রেজাউল করিম
পর্যবেক্ষণে দেখা যায় নারীর নগ্নতা ও অর্ধনগ্নতাকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ ধরনের বাণিজ্যিক ও মিডিয়া-চক্র গড়ে উঠেছে। এই চক্র নারীর শরীরকে বিনোদন, প্রচার, দর্শক আকর্ষণ এবং ব্যবসায়িক সাফল্যের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে। নানা আয়োজন, প্রলোভন, প্রচার এবং মিডিয়া কাভারেজের মাধ্যমে একজন নারীকে ধীরে ধীরে এমন একটি অবস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তার শরীরই হয়ে ওঠে তার ‘ব্র্যান্ড’ এবং আলোচনার প্রধান বিষয়।
আরও বিস্ময়কর হলো, এই নগ্নতা বা অর্ধনগ্নতাকে অনেক সময় ‘সাহস’, ‘আধুনিকতা’, ‘স্বাধীনতা’ এবং ‘নারীর অধিকার’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অর্থাৎ একটি বাণিজ্যিক সংস্কৃতি শুধু নারীর শরীরকে ব্যবহারই করছে না, সেই ব্যবহারের পক্ষে একটি আদর্শিক ভাষ্যও তৈরি করছে।
বেগম রোকেয়াকে আমাদের সমাজের আধুনিক নারী স্বাধীনতার প্রতীক বলা হয়। কেউ কি বলতে পারবে স্বাধীনতার উদ্যোগী সেই নারী নিজেকে কখনও অর্ধনগ্ন অবস্থায় উপস্থাপন করেছেন? সেক্ষেত্রে কারা নারীর নগ্নতাকে স্বাধীনতা বলে প্রচার করছে? তাদের উদ্দেশ্য কি ?
এখানে মজার ব্যপার হলো যেসব প্রতিষ্ঠান বা মিডিয়া-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রকাশ্যে নারীর নগ্নতা বা অর্ধনগ্নতাকে প্রচার ও উদযাপন করেন, তাদের অনেকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা নিজেদের পরিবারের নারী সদস্যদের একইভাবে জনসমক্ষে দেখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। তারা চান না নিজের মা, স্ত্রী, বোন বা কন্যারা একই ধরনের নগ্ন বা অর্ধনগ্ন অবস্থায় নিজেদের জনসমক্ষে উপস্থাপন করুক।
তাহলে প্রশ্ন হলো—
যে বিষয়টি নিজের পরিবারের ক্ষেত্রে অগ্রহণযোগ্য, অস্বস্তিকর কিংবা মর্যাদাহানিকর বলে মনে হয়, সেটিই অন্য নারীর ক্ষেত্রে কেন ‘স্বাধীনতা’, ‘অধিকার’ কিংবা ‘সেলিব্রিটি সংস্কৃতি’ হিসেবে উপস্থাপিত হবে?
যদি সত্যিই এটি নিঃশর্তভাবে নারীর স্বাধীনতার বিষয় হয়, তাহলে সেই স্বাধীনতার মানদণ্ড নিজের পরিবার এবং অন্যের পরিবারের ক্ষেত্রে আলাদা হবে কেন?
আর যদি নিজের পরিবারের নারীর ক্ষেত্রে একই বিষয়কে গ্রহণযোগ্য মনে না করা হয়, তাহলে অন্য নারীর শরীরকে একই কাজের জন্য ক্যামেরার সামনে তুলে ধরে সেটিকে ‘স্বাধীনতা’ বলে প্রচার করার নৈতিক ভিত্তিটিই বা কোথায়?

একজন নারী নিজের শরীর ও পোশাক সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবেন – এটি তার ব্যক্তিগত অধিকার। কিন্তু সেই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে ব্যবহার করে যখন অন্য কেউ অর্থ উপার্জন করে, ব্যবসা বাড়ায়, মিডিয়া-প্রভাব বিস্তার করে কিংবা একটি নির্দিষ্ট সামাজিক সংস্কৃতি তৈরি করতে চায়, তখন বিষয়টি আর শুধু ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মধ্যে থাকে না।
নারীর স্বাধীনতা মানে নারীকে বাজারের পণ্য বানানোর স্বাধীনতা নয়। নারীর অধিকার মানে তার শরীরকে অন্যের বিনোদনের উপকরণ বানানোর অধিকারও নয়।
নারীর প্রকৃত অধিকার নিয়ে কথা বলতে হলে তার নিরাপত্তা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সমান সুযোগ, মর্যাদা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলতে হবে। নারীকে কেবল তার শরীরের দৃশ্যমানতার ওপর ভিত্তি করে ‘সেলিব্রিটি’ বানানো নারীমুক্তির চূড়ান্ত রূপ নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি নারীকে নতুন ধরনের বাজারের পণ্যে পরিণত করার কৌশল হতে পারে।
সুতরাং প্রশ্নটি কোনো নারীর ব্যক্তিগত পোশাক পছন্দকে নিয়ন্ত্রণ করার নয়। প্রশ্নটি হলো—
অন্যের নারীত্ব ও শরীরকে নিয়ে যারা ব্যবসা, প্রচার ও বিনোদনের বাজার তৈরি করেন, তারা কি একই মানদণ্ড নিজেদের পরিবারের নারীদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতে প্রস্তুত?
যদি না হন, তাহলে ‘নারীর অধিকার’ ও ‘স্বাধীনতা’র এই প্রচারণার আড়ালে আসলে কার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে? নারীর, নাকি নারীকে নগ্ন করতে গড়ে ওঠা বাজার ব্যবস্থাপনার ?
সম্পাদকীয় ডেস্ক-১২/ডিএসই-৯

