Wednesday, July 29

আহমদ ছফার “বুদ্ধিবৃত্তিক নতুন বিন্যাস” এবং বুদ্ধিজীবিদের বিরক্তি

সোহরাব হোসেন

আহমদ ছফা

আহমদ ছফাকে বাংলাদেশের অনেক বুদ্ধিজীবী-লেখকের স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে ভীষণ কষ্ট হয়। তাঁর প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে পারলে যেনো বেঁচে যান তাঁরা। আহমদ ছফার আলোচিত একটি গ্রন্থ ’বুদ্ধিবৃত্তিক নতুন বিন্যাস’। তবে কোনো এক রহস্যজনক কারণে ছফার ‘বাঙালি মুসলমানের মন’সহ অন্যান্য গ্রন্থগুলো নিয়ে যতোটা আলোচনা হয়, এই গ্রন্থটি নিয়ে তেমন একটা আলোচনা হয় না। ১৯৭২ সালে লেখা এই গ্রন্থটির সর্বশেষ সংস্করণের (১৯৯৭) ভূমিকায় অবশ্য রহস্যের অনেকটা জট খুলে দিয়েছেন আহমদ ছফা নিজেই:

মাঝে মাঝে এমন চিন্তাও আমার মনে আসে, লেখাটি যদি না লিখতাম, হয়তো আমার জীবন অন্য রকম হতে পারতো। এই লেখার জন্যই আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীভূক্ত এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীর রোষ আমাকে পেছন থেকে অভিশাপের মতো তাড়া করেছে। অদ্যাবধি আমি জীবনে স্বস্তি কি বস্তু তার সন্ধান পাইনি। আগামীতে কোনোদিন পাবো, সে ভরসাই করিনে। তথাপি এই রচনাটি লেখার জন্য এক ধরনের গর্ব অনুভব করি।’

মাঝে মাঝে এমন চিন্তাও আমার মনে আসে, লেখাটি যদি না লিখতাম, হয়তো আমার জীবন অন্য রকম হতে পারতো। এই লেখার জন্যই আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীভূক্ত এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীর রোষ আমাকে পেছন থেকে অভিশাপের মতো তাড়া করেছে। অদ্যাবধি আমি জীবনে স্বস্তি কি বস্তু তার সন্ধান পাইনি। আগামীতে কোনোদিন পাবো, সে ভরসাই করিনে। তথাপি এই রচনাটি লেখার জন্য এক ধরনের গর্ব অনুভব করি।’

মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সুবিধাবাদী উচ্ছিষ্টভোগী বুদ্ধিজীবী এবং তাদের চ্যালাদের কাছে এই গ্রন্থটি খুব বেশি আলোচনায় আসার কথাও নয়। আসেওনি। এই গ্রন্থটিতে আ. লীগ, তার নেতৃত্ব এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের বিশ্লেষণও অসাধারণ দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন আহমদ ছফা। গ্রন্থটিতে উঠে এসেছে শিল্প-সাহিত্যের ভূমিকা প্রসঙ্গে গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য। বামপন্থী বা বিপ্লবী রাজনীতি কেনো এই দেশে বিকশিত হলো না সে প্রসঙ্গে ১১টি কারণ চিহ্নিত করেছেন, তা কোনো বামপন্থী তাত্ত্বিক বা সংগঠক অস্বীকার করতে পারবেন বলে মনে হয় না।

আহমদ ছফা তাঁর ‘বুদ্ধিবৃত্তিক নতুন বিন্যাস’ গ্রন্থে বলেছেন যে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এই শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীরা যে চিন্তা বা ভূমিকা নিয়েছিলেন তা বাংলাদেশের মানুষ শুনলে বাংলাদেশ স্বাধীনই হতো না। অর্থাৎ বুদ্ধিজীবীরা বিভ্রান্ত ছিলেন স্বাধীনতার প্রশ্নে। দ্বিতীয়ত এখনো যদি আমরা এই বুদ্ধিজীবীদের কথা শুনি বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হবে না। অর্থাৎ বুদ্ধিজীবী বলতে সমাজ বা মিডিয়া যাদের চিহ্নিত করছে অথবা যারা বুদ্ধিজীবী দাবি করছে তাদের কথা শুনলে বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা কখনোই পরিবর্তন হবে না।

বুদ্ধিবৃত্তিক নতুন বিন্যাস’ গ্রন্থের ভূমিকায় এই দেশের লুটেরা পুঁজিপতিদের উত্থান প্রসঙ্গে লেখক লিখছেন: ‘শেখ মুজিবের রাজত্বকালে এই কোটিপতিদের জন্ম। জিয়াউর রহমান তাঁদের লালন করেছেন এবং বাড়িয়ে তুলেছেন। এরশাদ সমাজ জীবনে তাঁদের আইনগত বৈধতা দিয়েছেন। হাল আমল পর্যন্ত এসে তাঁরা রাষ্ট্রযন্ত্রটা তাঁদের কব্জার মধ্যে এনে ফেলেছেন। তাঁদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন ছাড়া কোনো সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না। তাঁদের সক্রিয় মদদ ছাড়া কোনো দল সরকার গঠন করতে পারে না। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে ছোটোখাটো দলের সভা কিংবা শোভাযাত্রার জন্য তাঁদের চাঁদার ওপর নির্ভর করতে হয়।’