
রেজাউল করিম : বৃটিশ সংবাদ মাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্টে প্রকাশিত নিক ফেরিসের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিদেশি সহায়তা কমানোর কারণে বাংলাদেশে ব্রিটিশ অর্থায়নে পরিচালিত একটি জলবায়ু প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগেই বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। এতে হাজার হাজার ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ সহায়তা থেকে বঞ্চিত হবে এবং ইতোমধ্যে সম্পন্ন হওয়া কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ব্রিটিশ ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (FCDO) বর্তমানে বিদেশি সহায়তা বাজেটে ব্যাপক কাটছাঁট করছে। এর ফলে যুক্তরাজ্যের বৈদেশিক সহায়তা বাজেট জাতীয় আয়ের (GNI) ০.৫ শতাংশ থেকে কমে ০.৩ শতাংশে নেমে আসবে। এতে বেশ কয়েকটি উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সহায়তা সম্পর্ক প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই কাটছাঁটকে অনেকে “নৈতিক বিপর্যয়” হিসেবে অভিহিত করেছেন। বিশেষ করে জলবায়ু প্রকল্পে ব্রিটিশ সহায়তা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হলো ব্রিটিশ উন্নয়ন সংস্থা – প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন। ২০২৩ সাল থেকে সংস্থাটি বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি ও অ্যাকুয়াকালচার, খাদ্য উপকরণ ও প্রযুক্তি এবং চরম বৃষ্টিপাত ও ঘূর্ণিঝড়ের আগাম সতর্কবার্তা দিতে সক্ষম আবহাওয়া তথ্যব্যবস্থার মতো উদ্যোগের মাধ্যমে কয়েক হাজার মানুষের জীবনমান পরিবর্তন করার মতো বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পের একটি অংশ পরিচালনা করে আসছে।
প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন পরিচালিত প্রকল্পটি বিশ্বের বৃহত্তম জোয়ার-ভাটানির্ভর ম্যানগ্রোভ বন বাংলাদেশের সুন্দরবন এবং এর একটি বড় অংশ ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত। যা ২০২৩ সালে শুরু হয় এবং ২০২৮ সাল পর্যন্ত চলার কথা ছিল।
কিন্তু ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনকে জানানো হয় যে চলতি বছরের জুনের মধ্যেই তাদের প্রকল্পের কার্যক্রম শেষ করতে হবে বলে জানান সংস্থাটির বাংলাদেশে জলবায়ু সহনশীলতা বিষয়ক প্রধান তামান্না রহমান। যদিও অনেক লবিংয়ের পর সময়সীমা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয় বলে তিনি জানান।
তামান্না রহমান জানান,২০২৬ সালের মধ্যে প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের ২২ লাখ পাউন্ড পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা এর চেয়ে “অনেক কম” অর্থ পেয়েছে।
তিনি বলেন, এই আকস্মিক অর্থছাঁটাই স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে আমাদের সুনামকে হুমকির মুখে ফেলেছে। গত আড়াই বছরে আমরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই আস্থা তৈরি করেছি। একই সঙ্গে আমাদের উদ্যোগগুলোর দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কার্যকরভাবে প্রকল্প থেকে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা করার সক্ষমতাও সীমিত হয়ে গেছে।
প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের প্রকল্পে এই কাটছাঁটাই সামগ্রিক ব্রিটিশ-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সহায়তা কর্মসূচির কাটছাঁটের একটি ছোট অংশ মাত্র।
জুলাই মাসে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যে বাংলাদেশে যুক্তরাজ্যের দ্বিপক্ষীয় সহায়তার পরিমাণ ৬৬.৭ মিলিয়ন পাউন্ড থেকে কমে ৩১ মিলিয়ন পাউন্ডে নেমে আসবে।
তামান্না রহমান আরও বলেন, প্রকল্পটি আগেভাগে বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি আরও ক্ষতিকর, কারণ জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় ওইসব জনগোষ্ঠীর যতটা সম্ভব সহায়তা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে এবং মাটিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই ধরনের অর্থায়নের বিপুল চাহিদা রয়েছে। অথচ আমাদের বাস্তব ও কার্যকর কর্মসূচি বাস্তবায়নের সক্ষমতা দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে।
প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের উদ্বেগের বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ব্রিটিশ লেবার এমপি এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক কমিটির চেয়ার সারাহ চ্যাম্পিয়ন বলেন – এ ধরনের প্রকল্প যদি দুই বছর আগেই এবং অল্প সময়ের নোটিশে বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে নিম্ন-আয়ের দেশগুলোকে সহায়তা করার বিষয়ে যুক্তরাজ্যের অঙ্গীকার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ ব্রিটিশ করদাতাদের অর্থের দুর্বল ব্যবহার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় যুক্তরাজ্যকে একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে যে সুনাম রয়েছে, সেটিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বছরে ৩ সেন্টিমিটার সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি
গঙ্গা বদ্বীপে অবস্থিত সুন্দরবনে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী মিলিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে প্রবাহিত হয়েছে। বিশাল এই ম্যানগ্রোভ বনভূমির আয়তন ১০,২৭৭ বর্গকিলোমিটার।

এখানে ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী রয়েছে, যার মধ্যে বিপন্ন বাঘ ও নদীর ডলফিনও রয়েছে। এছাড়া প্রায় ৩০০ প্রজাতির পাখি রয়েছে।
প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের সহায়তা পাওয়া জনগোষ্ঠীগুলো এই অনন্য পরিবেশগত অঞ্চলের প্রান্তবর্তী এলাকায় বসবাস করে। ঐতিহ্যগতভাবে তারা মাছ, জ্বালানি কাঠ ও মধুসহ বিভিন্ন বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। বর্তমানে তাদের অনেকেই কৃষিকাজও করেন। তবে ব্যাপক নিরক্ষরতা এবং বাংলাদেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিচ্ছিন্নতার কারণে তারা দেশের সবচেয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রয়েছে।
২০০৯ সালে সুন্দরবনে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় আইলার পরবর্তী প্রভাবও অনেক মানুষ এখনও বহন করছে। ঘূর্ণিঝড়টিতে আনুমানিক ১ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। স্থানীয় অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি অনেক এলাকার ভূপ্রকৃতি ও পরিবেশও ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়।
সুন্দরবনে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বছরে আনুমানিক ৩ সেন্টিমিটার করে বাড়ছে—যা বৈশ্বিক গড় বৃদ্ধির প্রায় দ্বিগুণ। দ্রুত সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে জনগোষ্ঠীগুলো বাস্তুচ্যুত হচ্ছে এবং একসময় উর্বর কৃষিজমি লবণাক্ত হয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

তামান্না রহমান বলেন, যেখানে প্রকল্পটি ডিসেম্বর ২০২৮ পর্যন্ত চলার কথা ছিল, সেখানে মাত্র দুই থেকে তিন মাসের নোটিশে সবকিছু গুটিয়ে নিতে বলা অত্যন্ত কঠিন ছিল। প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন সবসময় একটি যথাযথ ‘exit plan’ বা প্রকল্প-সমাপ্তি পরিকল্পনা অনুসরণ করে। এর মধ্যে থাকে জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ ও সক্ষম করে তোলা এবং বিভিন্ন উদ্যোগ স্থানীয় সরকারের কাছে হস্তান্তর করা। কিন্তু এবার আমরা সেটি পুরোপুরি করতে পারিনি।
ব্রিটিশ উন্নয়ন সংস্থাগুলোর নেটওয়ার্ক Bond-এর প্রধান নির্বাহী রোমিলি গ্রিনহিল বলেন – ব্রিটিশ অর্থায়নে পরিচালিত মানবিক ও জলবায়ু অভিযোজন কর্মসূচি বাতিলের ঘটনা লেবার সরকারের স্বল্পদৃষ্টিসম্পন্ন ব্রিটিশ সহায়তা কমানোর কঠোর বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে এটি বিশ্বজুড়ে সংঘাত, দারিদ্র্য ও জলবায়ু সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব মোকাবিলা করা জনগোষ্ঠীগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবনরেখা হারানোর সমান।
তিনি বলেন, নতুন লেবার নেতৃত্ব, প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড – যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন নীতির ক্ষেত্রে “দিক পরিবর্তনের” সুযোগ রয়েছে।
তিনি নতুন প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান, ব্রিটিশ বৈদেশিক সহায়তা বাজেটে আর কোনো কাটছাঁট না করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে, ব্রিটিশ সহায়তা পুনরায় GNI-এর ০.৭ শতাংশে ফিরিয়ে নেওয়ার একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করতে এবং উচ্চমানের আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন সুরক্ষিত রাখতে।
কানিজ-২৩/ডিএসই-৮
