Thursday, September 3

এই মুহূর্তে সরকারের চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বেশি জনপ্রিয় : দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) আয়োজিত এক সংলাপে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য – ছবি :সংগৃহিত

বিশেষ প্রতিনিধি : সরকারের প্রথম ছয় মাসে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, বিদ্যুৎ-জ্বালানি পরিস্থিতি ও অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক পর্যালোচনা করে ‘উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগের জায়গাটাই’ বেশি দেখছেন অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তার যে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা আছে, সেটা দিয়ে উনি রাজনৈতিক সাহস দেখিয়ে নিজের দলের লোকজনদের ঠিক পথে পরিচালনা করতে পারবেন কি না, আমলাকে ঠিক জায়গাতে রাখতে পারবেন কি না – এটিই আমি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখি।

সোমবার রাজধানীতে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) আয়োজিত এক সংলাপে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ছয় মাসের সরকারের সামগ্রিক মূল্যায়নে ” দিতে চাই ‘এ’, কিন্তু টানে তো ‘বি’-এর দিকে। “

তিনি আরো বলেন, এই পরিস্থিতিতে কোথাও সেই অর্থে উৎসাহিত বা উত্তেজিত হওয়ার কোনো কারণ আমরা এই মুহূর্তে দেখছি না। কোনো উন্নতি হয়নি এটা বলব না, স্থিতিশীলতা কোনোখানে নাই এটাও বলব না, কিন্তু যে পরিমাণের এখানে চাঞ্চল্য এবং অগ্রগতি দরকার সেটা আমরা লক্ষ্য করছি না।

তিনি বলেন, অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও সামগ্রিক পরিস্থিতিতে স্বস্তির কারণ তিনি দেখছেন না।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসের ৩৬২টি পদক্ষেপ ও পর্যবেক্ষণ পর্যালোচনা করে সিপিডি এই মূল্যায়ন করেছে। শাসন ও প্রশাসন, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা, শিল্প ও বাণিজ্য, ব্যাংক ও আর্থিক খাত, জ্বালানি ও পরিবহন, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষাসহ নয়টি খাত এতে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

বিএনপি সরকারের ছয়মাসে অর্থনীতির ৩১টি সূচক পর্যালোচনা করে তার মধ্যে ১৯টিতে অবনমন এবং মাত্র ১২টিতে উন্নতি পাওয়া গেছে বলে তুলে ধরেন দেবপ্রিয়।

তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা উন্নতি হলেও রাজস্ব আদায়, বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও জ্বালানি পরিস্থিতিতে উদ্বেগ রয়েছে।

সিপিডির পর্যালোচনার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতির জন্য ঋণপত্র খোলার প্রবৃদ্ধিও ইতিবাচক থেকে নেতিবাচক হয়েছে এবং নিট বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে।

দেবপ্রিয় বলেন, দেখেছি যে পুঁজিপণ্য কিছুটা বেড়েছে কিন্তু বৈদেশিক ঋণ, আগামী দিনের জন্য পুঁজিপণ্য আনার পরিসংখ্যান এবং ব্যক্তিখাতে ঋণ সঞ্চালন এই সবগুলোতেই বড় ধরনের অবনমন ঘটেছে। এটা অনেক চিন্তার বিষয়।

উৎপাদন খাতের পরিস্থিতিকে ‘শঙ্কাজনক’ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, সবচেয়ে চিন্তার বিষয় যেটা বেশি, আপনারা দেখেন সর্বকালের সর্বনিম্ন ঋণ গেছে ব্যক্তিখাতের ক্ষেত্রে। সাড়ে ৪ শতাংশে নেমে গেছে।

অর্থাৎ আপনারা যদি ব্যক্তিখাতে ঋণ, পুঁজিপণ্যের আমদানি এবং এর সাথে বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং আমাদের উৎপাদন সূচক দেখেন শিল্প সূচকে, তাহলে উৎপাদন খাতে এই মুহূর্তে স্থবিরতা বলাটা কম বলা হবে। এটা একটা শঙ্কাজনক অবস্থার ভেতরে আছে। এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নাই।

সিপিডির পর্যালোচনায় আরো বলা হয়েছে, মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যা, বিকল্প এলএনজি কার্গো সংগ্রহে জটিলতা এবং সরবরাহ পরিকল্পনার দুর্বলতায় গ্যাসনির্ভর শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

টেক্সটাইল, ইস্পাত, কাগজ, পার্টিকেল বোর্ড ও সিরামিকসহ বিভিন্ন শিল্পে এর প্রভাব পড়েছে। মার্চ-এপ্রিল সময়ে শিল্প উৎপাদনের সাধারণ সূচক এবং উৎপাদনশিল্পের সূচকের প্রবৃদ্ধি শূন্যে নেমে আসে।

সিপিডির পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরের তিন প্রধান শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এতে ৬১ হাজার ৮৮১ জনের কর্মসংস্থান হারিয়েছে।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রায় ৪২ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে। সেই বিবেচনায় রাজস্ব আদায় পরিস্থিতিও ‘উদ্বেগজনক’ বলে মনে করছে সিপিডি।

বাস্তব পরিস্থিতিতে চলতি অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংস্থাটি। এনবিআরের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ১ শতাংশ এবং মোট কর রাজস্বের প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৯ শতাংশে নেমেছে।

দেবপ্রিয় বলেন, রিজার্ভ বাড়া বা পুঁজিপণ্য আমদানির মত কিছু সূচক ইতিবাচক দেখালেও সেগুলোর পেছনের কারণও বিবেচনায় নিতে হবে।

সিপিডির পর্যালোচনায় ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত বিপিএম-৬ পদ্ধতির হিসাবে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে। তবে একই সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে এবং চলতি হিসাব উদ্বৃত্ত থেকে ঘাটতিতে গেছে।

সরকারের কাঠামো নিয়েও মন্তব্য করেন দেবপ্রিয়। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এবং বিভিন্ন পদমর্যাদার বিশেষ সহকারীদের নিয়ে গঠিত সরকারকে তিনি ‘আড়াই-তলা সরকার’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

সিপিডির এই ফেলো বলেন, এই মুহূর্তে সরকারের চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বেশি জনপ্রিয়। সরকারের যে অ্যাপ্রুভাল রেটিং, সেটাও খারাপ না, ৫০-এর উপরে। কিন্তু জনপ্রিয় হলেন প্রধানমন্ত্রী।

হামিম-২৪/ডিএসই-৮