
রোম, ৪ সেপ্টেম্বর: ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির নেতৃত্বাধীন সরকার দেশটির যুদ্ধ-পরবর্তী ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সরকার হিসেবে নতুন রেকর্ড গড়েছে। শুক্রবার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর বারিতে হাজার হাজার সমর্থকের সমাবেশের মধ্য দিয়ে এই অর্জন উদযাপন করছে তাঁর দল ব্রাদার্স অব ইতালি (FdI)।
‘আজ আমাদের সরকার ইতালীয় প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সরকারে পরিণত হয়েছে,’ শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন মেলোনি।
তিনি বলেন, ‘আমি এই অর্জনকে কৃতজ্ঞতা ও গভীর দায়িত্ববোধের সঙ্গে গ্রহণ করছি। কারণ স্থিতিশীলতা কোনো প্রদর্শনযোগ্য রেকর্ড নয়; বরং এটি এমন একটি শর্ত, যা একটি দেশকে পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত নিতে, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্মান অর্জন করতে সক্ষম করে।’
২০২২ সালের ২২ অক্টোবর ইতালির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে টানা ১৪১৩ দিন ক্ষমতায় থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বার্লুসকোনির দ্বিতীয় সরকারের ১৪১২ দিনের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
৮০ বছরে ইতালিতে ৬৮টি সরকার গঠিত হয়েছে। রাজনৈতিক সংকট, জোটের ভাঙন ও শরিকদের দলত্যাগের কারণে দেশটির সরকারগুলোর মেয়াদ ঐতিহাসিকভাবেই স্বল্পস্থায়ী।
বারিতে সমাবেশ, সামনে ২০২৭ নির্বাচন
মেলোনির দল ব্রাদার্স অব ইতালি আয়োজিত সমাবেশে যোগ দিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কয়েক ডজন বাসে করে সমর্থকেরা বারিতে আসছেন। বন্দরের একটি এলাকায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রায় ১০ হাজার মানুষের সমাগম হতে পারে বলে জানিয়েছে আয়োজকেরা।
সন্ধ্যায় সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেবেন মেলোনি। তাঁর জোট সরকারের উপপ্রধানমন্ত্রী মাত্তেও সালভিনি ও আন্তোনিও তাজানিও ভিডিও সংযোগে অনুষ্ঠানে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
“Il Governo piu stabile, l’Italia piu fort” – অর্থাৎ ‘সবচেয়ে স্থিতিশীল সরকার, শক্তিশালী ইতালি’ – স্লোগানে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি ২০২৭ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগাম প্রচারণার আবহও তৈরি করেছে।
সরকারের প্রায় চার বছরের সাফল্য তুলে ধরাই হবে অনুষ্ঠানের মূল বিষয়। মেলোনি সরকারের দাবি, এই সময়ে ১০ লাখের বেশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, ব্যক্তিগত আয়কর ২১ বিলিয়ন ইউরো কমানো হয়েছে এবং ঋণে জর্জরিত ইতালির আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
তবে সমালোচকেরা বলছেন, মজুরি কি বেড়েছে? না। পেট্রোলের দাম বেড়েছে, চাকরির অনিশ্চয়তা বেড়েছে, মানুষ কম অবসরে যাচ্ছে এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার কার্যকারিতাও কমেছে।
মেলোনি সরকারের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক অগ্রাধিকার অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ। তাঁর দল দাবি করছে, সরকারের নীতির ফলে অবৈধ অভিবাসীদের আগমন ৮০ শতাংশ কমেছে।
মেলোনির জোটে রয়েছে কট্টর ডানপন্থী ও অভিবাসনবিরোধী লীগ এবং মধ্য-ডানপন্থী ফোরজা ইতালিয়া। সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রায় ৩০০টি আইন ও ডিক্রি পাস করেছে, যার বড় একটি অংশ নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্ট।
তবে সমালোচকদের মতে, অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও উৎপাদনশীলতার মতো কাঠামোগত সমস্যার সমাধানে সরকারের সাফল্য সীমিত।
মেলোনির সমর্থকেরা যখন বারির বন্দরে উৎসবে মেতেছেন, তখন শহরের ঐতিহাসিক কেন্দ্রজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁর সমালোচকেরা।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, সরকার ‘যুদ্ধ ও অস্ত্রনির্ভর অর্থনীতি’ তৈরি করছে এবং দেশকে ‘পুলিশি রাষ্ট্রে’ পরিণত করছে। একই সঙ্গে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষের পরিবেশ তৈরির অভিযোগও রয়েছে।
এর মধ্যেই মেলোনির ডানদিকে আরও কট্টর রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটছে। সাবেক জেনারেল রবার্তো ভান্নাচ্চির নেতৃত্বাধীন ‘ফুতুরো নাজিওনালে’ (FN) দল মেলোনির ব্রাদার্স অব ইতালির চেয়েও বেশি কট্টর ডানপন্থী অবস্থান নিয়েছে।
দলটির জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে এবং সাম্প্রতিক জনমত জরিপে এটি মেলোনির জোটের শরিক লীগ ও ফোরজা ইতালিয়াকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ফলে ২০২৭ সালের নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, মেলোনির সামনে শুধু ক্ষমতা ধরে রাখাই নয়, ডানপন্থী রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক-০৪/ডিএসই-৯
